
১৯৭১ সালে বর্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণে এই ভূ-খণ্ডের মুক্তিকামী মানুষের যখন চরম দুঃসময় চলছিল, তখন কারারুদ্ধ বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে কাণ্ডারীবিহীন নিপীড়িত মানুষের হাল ধরেছিলেন বিদগ্ধ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তাজউদ্দীন আহমদ। তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে মেধা, দক্ষতা, যোগ্যতা, সততা ও আদর্শবাদের অনন্য এক প্রতীক। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান এই সংগঠক দেশ ও দেশের মানুষের জন্য অসামান্য অবদান রেখেছেন।
আজ ২৩ জুলাই বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের ৯৪তম জন্মবার্ষিকী। ১৯২৫ সালের এই দিনে গাজীপুরের কাপাসিয়া থানার দরদরিয়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মৌলভী মো. ইয়াসিন খান এবং মাতা মেহেরুননেসা। ৪ ভাই, ৬ বোনের মাঝে ৪র্থ তাজউদ্দীন আহমদের পড়াশোনা শুরু বাবার কাছে আরবি শিক্ষার মাধ্যমে। তিনি পড়েছেন কালিগঞ্জ সেন্ট নিকোলাস ইন্সটিটিউশন, ঢাকার মুসলিম বয়েজ হাই স্কুল ও সেন্ট গ্রেগরিজ হাই স্কুলে৷তাজউদ্দিন ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (তৎকালীন জগন্নাথ কলেজ) থেকে অবিভক্ত বাংলার সম্মিলিত মেধাতালিকায় যথাক্রমে দ্বাদশ ও চতুর্থ স্থান (ঢাকা বোর্ড ) লাভ করেন। ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে বি.এ (সম্মান) ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৬৪ সালে রাজনৈতিক বন্দী হিসেবে কারাগারে থাকা অবস্থায় এল.এল.বি. ডিগ্রী পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হন। তাজউদ্দীন ছাত্রজীবনেই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর থেকে এ দেশে ভাষার অধিকার, অর্থনৈতিক মুক্তি এবং সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী যত আন্দোলন হয়েছে, তার প্রতিটিতেই তাজউদ্দীন আহমদের ভূমিকা ছিল অনন্য।
তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন একজন সৎ ও মেধাবী রাজনীতিবিদ। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি গঠিত পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের (বর্তমানে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। ১৯৪৮-এর ১১ এবং ১৩ মার্চ সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে তিনি ধর্মঘট-কর্মসূচি ও বৈঠকে অংশ নেন। একইভাবে ২৪ মার্চ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সাথে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের নেতারাসহ তিনি বৈঠক করেন৷ ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। তিনি ছিলেন সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদেরও সদস্য।আওয়ামী লীগের গঠন-প্রক্রিয়ার মূল উদ্যোক্তাদেরও একজন তিনি। ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৭ পর্যন্ত ঢাকা জেলা আওয়ামী মুসলিম লীগের (১৯৫৫ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ নাম পরিবর্তিত হয়ে হয় আওয়ামী লীগ) সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৪-এর নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট প্রার্থী হিসেবে মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদককে পরাজিত করে পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন তাজউদ্দীন আহমদ।১৯৬৪ সালে প্রাদেশিক আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং ১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। একই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৬ সালে তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ওই বছরই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির মুক্তিসনদ ৬ দফা ঘোষণা করেন। ৬ দফার অন্যতম রূপকার ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ।১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর গণরায়কে কার্যত অস্বীকার করে সামরিক শাসকগোষ্ঠী আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় ১৯৭১ সালের মার্চে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে শুরু হয় দুর্বার অসহযোগ আন্দোলন। এ আন্দোলন পরিচালনায় তাজউদ্দীন আহমদ যথেষ্ট সাংগঠনিক দক্ষতা ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেন।২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয় এবং একতরফা হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। শুরু হয় বাঙালির সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তখন মূল কাণ্ডারির ভূমিকা পালন করেন তাজউদ্দীন আহমদ। তাজউদ্দীনের ভাষায়, ‘আমি সেদিন সাড়ে সাত কোটি বাঙালির স্বার্থে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম তা হলো- একটি স্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনার জন্য কাজ শুরু করা৷’
তার জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি ১৯৭১ সালে এক চরম সংকটময় মুহূর্তে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠন করে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে সফল ভূমিকা পালন। নানা পরিক্রমা পেরিয়ে যুদ্ধ চলাকালীন ১০ এপ্রিল মেহেরপুর জেলার মুজিবনগরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সনদ ঘোষণা করা হয়। ১১ এপ্রিল তাজউদ্দীন বেতারে ভাষণ দেন। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে আনুষ্ঠানিকভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। দুঃসময়ের বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ তাজউদ্দীন আহমদ হন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। অস্থায়ী সরকার ১৬ই ডিসেম্বর স্বাধীনতা অর্জন পর্যন্ত কলকাতা থেকে কার্য পরিচালনা করে। দৃঢ়তা ও নিষ্ঠার সাথে যার নেতৃত্ব দেন তাজউদ্দীন আহমদ।





