তথ্য প্রযুক্তি

বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে জীবনমুখী গানের কিংবদন্তি শিল্পী নচিকেতা চক্রবর্তী।

বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে জীবনমুখী গানের কিংবদন্তি শিল্পী নচিকেতা চক্রবর্তী। তাঁর গানে আন্দোলিত হয়না এমন মানুষ মেলা ভার। কিন্তু তাঁর গান নিয়ে কিছু লিখা বা আলোকপাত করার মত দৃষ্টতা দেখানোর মানুষ ও খুব একটা দেখা যায় না।

দৃষ্টতা দেখাবোনা, কিন্তু ভালবাসাতো দেখানো যেতেই পারে। চাল চুলোহীন বেকার যবুককে সাহস সান্তনা বা প্রেরণা দেওয়ার জন্য তিনি কণ্ঠে যেনো বোমা ফাটালেন, এই বেশ ভালো আছি গেয়ে।
চেহারায় কোন আভিজাত্য নেই, মুখ ভর্তি দাড়ি আর রংচটা জিন্স পড়া লোকটিই যেন হয়ে উঠলেন লাখো লাখো যুবকের আইডল। এই বেশ ভাল আছি দিয়ে শুরু তারপর যা হল তা আবিশ্বাস ইতিহাস।
পুরো উপমহাদেশে বুদ হয়ে রইলো নচিকেতায় ।
“সে প্রথম প্রেম আমার নীলাঞ্জনা” আহ কৈশোরের প্রেমকে যেভাবে গানের মধ্যে নিয়ে আসলেন এখানেই বুঝিয়ে দিলেন তিনি অনন্য ও অদ্বিতীয় আর। কান দিয়ে গানটা শুনবেন শুধু আর
চিত্রনাট্যের মত গানের প্রেক্ষাপট আপনার চোখে ভাসবে। গান-প্রেম আর শৈশবকে চোখের সামনে উপস্থাপন করার দায়িত্বটা যেন নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছেন শিল্পী নচিকেতা।
প্রিয়তমার মন জয় করার জন্য যে শিল্পী কন্ঠে ধারণ করেছেনঃ
তুমি আসবে বলে আকাশ মেঘলা
বৃষ্টি এখনো হয়নি
তুমি আসবে বলেই
কৃষ্ণচূড়ার ফুলগুলি ঝরে যায়নি ।
সেই তিনি প্রমাণ করেছেন প্রেম বা ভালবাসাবাসি মানেই মিথ্যে কথার ফুলঝুড়ি বা চাটুকারিতা নয়।
তিনি অবলীলায় গেয়ে উঠেন-
এই তুমি কি আমায় ভালবাসো
যদি না বাসো তবে পরোয়া করি না
আমি সূর্যের থেকে ভালবাসা এনে
সাজাবো এ মন তার রং দিয়ে
পোশাকী প্রেমের প্রয়োজন বোধ করি না।
অথবা, রেল লাইনে বডি দেব মাথা দেব না।
ভ- প্রতারকদের মত তিনি মিথ্যা অভিনয় না করে সত্য সুন্দর প্রেমকে তিনি স্বীকার করেছেন দ্বিধাহীন কণ্ঠে। ঘুষ খুরদের অবাঞ্জিত ঘোষণা করে তিনি প্রেমিকের পক্ষ নিয়েছেন। তিনি দ্বিধাহীন ভাবে গেয়েছেন-
সে ছিল তখন উনিশ
আমি তখন ছত্রিশ
প্রেমে পড়তে লাগে না বয়স
মনে থাকে না উনিশ- বিশ।
মন মন মনতো চাইলো
বিবাহিত আমি তাতে কি হলো
অনুভূতির কি বাধ্যতামূলক
একই থাকে অহর্নিশ।
গানের মধ্যে দিয়ে যে গালি দেওয়া যায় তা বোধ হয় নচিকেতাই প্রথম দেখিয়েছেন। তাও আবার যেন তেন গালি নয় শুয়রের বাচ্চার মত গালি। আর এই

গালি কাদেরকে দিয়েছেন সেটাতো বিস্ময়।
ভারতীয় উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে মন্ত্রী কিন্তু ছোট খাটো কোন পদবি নয়। যখন তিনি গিয়ে উঠেন-
নিপাত থাক রাজনীতি
মন্ত্রী সব গ-গুল
শুয়রের বাচ্চারই
করাপ্টেড দেশটা পিজরাপুল।
তখন আমাদের বুঝে নিতে হয় তাঁর কলিজাটা কত্ত বড়। অসৎ মন্ত্রীদের নচিকেতা তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেছেন অবলীয়। যেখানে সারা পৃথিবীর পিতা মাতারা স্বপ্ন দেখেন সন্তানদের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা উকিল ব্যারিস্টারি বানাবেন সেখানে তিনি অসৎ মন্ত্রীদের অবজ্ঞা আর ইঙ্গিত করে গেয়েছেন
আমার সোনা চাঁদের কণা
আর কি কি বলবো
ডাক্তার উকিলতো নয়
তোকে মন্ত্রী বানাবো
তারপরে চার পুরুষ
বসে বসে খাব।
আজন্ম বিদ্রোহী এই মানুষটা নিঃসন্দেহ একজন রাজনীতি সচেতন নাগরিক। আজ থেকে প্রায় ১৭ বছর আগের লেখা একটি গান আমাদেন সমসাময়িক রাজনীতির সাথে যখন একেবারেই মিলে যায়, তখন বুঝা যায় তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা কত প্রখর। বর্তমান রাজনীতিতে ত্যাগীরা যেভাবে বঞ্চিত হচ্ছে আর চাটুকায় ও সুবিধা ভোগীরা যেভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার আর সম্পদের পাহাড় বানাচ্ছে তাতে বোধ করি এই গানটি একেবারেই সমসাময়িক-
আদিত্য সেন এক রাজনীতিবিদ
কলোনির ঘরে যার বাস
আদিত্য সেন এক সৎ মানুষ
আধপেটা খেয়ে বারোমাস
আদিত্য সেন পিঠ সোজা রাখেন
পার্টির হোলটাইমার
আধপেটা খেয়ে থাকবেন তবু
মুুদির দোকানে নেই ধার
আদিত্য সেন আদিত্য সেন
সূর্যের মত যার নাম
আদিত্য সেন আদিত্য সেন
আজ প্রয়োজন বড় আপনার ।।
আদিত্য সেন ভাঙে প্রোমোটার রাজ
আদিত্য পুকুর বাঁচায়
আদিত্য সেন যেন সয়ং লেলিন
বিপদকে আঙুল নাচায়
আদিত্য সেন বলে স্পষ্ট কথা
তত্ত্বের কী বা প্রয়োজন
মানুষের প্রয়োজন যিনিই দাঁড়ান
তার আগে কি তত্ত্ব কথন
আদিত্য সেন আদিত্য সেন
সূর্যের মত যার নাম
আদিত্য সেন আদিত্য সেন
আজ প্রয়োজন বড় আপনার।।
আদিত্য সেন লাল স্বপ্ন দেখেন
সকলের সমান অধিকার
আদিত্য মানুষের খিদের শমন
যার ঘরেতে ঘোর অনাহার
আদিত্য তার শিশু সন্তানকে
লেলিনের গল্প শোনান
‘উই শেল ওভারকাম সামে ডে ’
দৃড়তার সাথে যিনি গান
আদিত্য সেন আদিত্য সেন
সূর্যের মত যার নাম
আদিত্য সেন আদিত্য সেন
আজ প্রয়োজন বড় আপনার ।॥
ঐ যে দূরে যাকে দেখছো বসে
পাত্র হাতে ভিক্ষার
বহিষ্কৃত তিনি পার্টি থেকে
আদিত্য সেন নাম তার।।
রাজনীতি করতেন তার সাথে যারা
গাড়ি গাড়ি করে তারা সৎ
রাজনীতিতে নেই সততার ঠাঁই
একথার নেইকো দ্বিমত
তবুও আদিত্য ভুলিনি কিছুই
আমরা প্রতীক্ষায়
এই নপুংসকের রাজনীতি ছেড়ে
কবে আপনার হবে উদয়
আদিত্য সেন আদিত্য সেন
সূর্যের মত যার নাম
আদিত্য সেন আদিত্য সেন
আজ প্রয়োজন বড় আপনার।।
চারিদিকে অন্যায় আর অসত্যের ভীড়েও নচিকেতা আমাদের আশার বাণী শুনিয়েছেন। দেখিয়েছেন বেঁচে থাকার স্বপ্ন। তিনি গেয়েছেন,
একদিন ঝড় থেমে যাবে
পৃথিবী আবার শান্ত হবে
বসতি আবার উঠবে গড়ে ,
আকাশ আলোয় উঠবে ভরে,
জীর্ণ মতবাদের ইতিহাস হবে,
পৃথিবী আবার শান্ত হবে।
বৃদ্ধাশ্রম, পৌলমী, অনির্বাণ শতরূপার চিঠি, আমি মুখ্য সুখ্য মানুষ, পুরোনো দিনের গান ইত্যাদি শিরোনামের গানগুলো শুনলে আমাদের মনে হতেই পারে ‘আমিই নচিকেতা’।

লেখক: ব্যাংকার ও সঙ্গীতানুরাগী।

Close
Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker